ডায়েট!

শব্দটি শুনলেই যেন ভয়ে আমরা কেঁপে উঠি। চোখের সামনেই ভেসে উঠে একজন স্থুলকায় ব্যক্তির না খেয়ে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা। দিন শেষে সারাদিন না খেয়ে থাকা। সারাদিন দুর্বল অবস্থায় থাকা।

কিন্তু আসলেই কি ডায়েট অর্থ শুধুই না খেয়ে থাকা? ডায়েট কি শুধুই ওজন কমানোর জন্যে? ডায়েট মানেই কি সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকা?

একদমই না ডায়েট মানে কখনোই ক্ষুধার্ত থাকা না। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হিসেব নিকেশ করে খাওয়া দাওয়াকেই বলা যায় ডায়েট। যদি আরোও ভেঙ্গে বলা যায়, তবে ডায়েট হলো খাদ্যগুণ বিবেচনা করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার গ্রহণ করা যেন শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত না হয়।

আজ আমরা এমন ই কিছু বিশেষ ডায়েট সম্পর্কে জানব।

লো কার্ব ডায়েট

লো কার্ব ডায়েট, সবচেয়ে প্রচলিত ডায়েট এর মধ্যে অন্যতম। লো কার্ব ডায়েট এমন এক ধরনের ডায়েট যেখানে দানাদার কিংবা শর্করা জাতীয় খাদ্য কে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে রাখা হয়।অর্থাৎ ভাত, রুটি, মিষ্টি জাতীয় খাবার, পাউরুটি ইত্যাদি খাবার এর পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়।

অন্যদিকে, বৃদ্ধি পায় আমিষ এবং তেল, চর্বি জাতীয় খাদ্য। ওজন কমাতে এই ডায়েটের ভুমিকা অপরিহার্য। যারা কিনা ডায়বেটিস এবং হাই কোলেস্টেরল এর জটিলতায় ভুগছেন তারাও এই ডায়েট করে বেশ উপকার পেয়ে থাকেন।
এই ডায়েটের উপকারিতা এত বেশি যে তা হয়ত আজকে লিখে অল্প কথায় শেষ করা সম্ভব হবেনা। তবে কিছু
উপকারিতা দেওয়া হলোঃ

১। ক্ষুদার পরিমাণ কমে যায়
২। ওজন দ্রুত কমতে থাকে
৩। রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল এর পরিমাণ কমা
৪। ভাল কোলেস্টেরল এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া
৫। রক্তে ব্লাড স্যুগার এর মান হ্রাস পাওয়া

কিটো ডায়েট

কাটা দিয়ে কাটা তোলা কথাটি শুনেছেন কখনো? কিটো ডায়েটও তেমনি এক ধরনের ডায়েট।

এই ডায়েট কে বলা যায় লো কার্ব ডায়েটের একটি চুড়ান্ত রুপ।এই ডায়েটের খাদ্য সমুহের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ থাকে ফ্যাট, প্রোটিন এবং অত্যন্ত নিম্ন বা নগন্য পরিমাণে থাকে শর্করা। ফ্যাট লস বা ওজন কমানোর জন্যে এই ডায়েট অন্যতম কার্যকর ডায়েট। তবে এই ডায়েট খুবই স্ট্রিক্ট একটি ডায়েট। সামান্য পরিমাণে ভাত কিংবা রুটি খেতেও পারবেন না। এমন কি সব ধরনের ফল থেকেও বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি এই ডায়েট মেনে চলাটাও বেশ কঠিন। প্রতিটি খাবারের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে
অনুসরণ করতে হয়। এই ডায়েটেরও বেশ কিছু উপকারিতা রয়েছে। তবে এখানে সংক্ষেপে কিছু বর্ণ্না করা হলো-

১। দ্রুত ওজন কমা
২। ক্ষুধা কমে যাওয়া
৩। অল্প খেয়েও শরীর সতেজ থাকা
৪। ইনসুলিন এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া
৫। ব্লাড স্যুগার এর পরিমাণ কমে যাওয়া
৬। রক্তচাপ কমে যাওয়া
৭। যকৃতে জমা চর্বির হ্রাস অথবা বিলুপ্তি ঘটা।

আরও পড়ুনঃ ওজন কমানোর আদ্যোপান্ত

হাই কার্ব ডায়েট

এই ডায়েটটি তাদের জন্যে যারা কিনা ওজন বাড়াতে চান। যারা কিনা মাসল বিল্ড করতে চান কিংবা নিজের ওজন নিয়ে অসন্তুষ্ট, অথবা রুগ্ন শরীর থেকে মুক্ত পেতে চান এই ডায়েটটি তাদেরই জন্যে।

এই ডায়েটে শর্করার পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। যারা এরকম ডায়েট করে থাকেন তাদের আসল উদ্দেশ্য মাসল গেইন কিংবা ওজন বৃদ্ধি।যারা কিনা খুব বেশি খেতে পারেন না কিন্তু ওজন নিয়ে অসন্তুষ্ট তারা চাইলে খুব সহজেই এই ডায়েট টি অবলম্বন করতে পারেন।

সাধারণত আপনার দৈনন্দিন খাদ্যের ৪৫-৬০ ভাগ হতে হবে কার্বহাইড্রেট। হাই কার্ব ডায়েটের উপকারিতা-

১। হাই কার্ব ডায়েট ক্ষুদা বাড়িয়ে দেয়
২। ওজন দ্রুত বৃদ্ধি তে সহায়তা করে
৩। যারা নিয়মিত ব্যায়াম এর সাথে জড়িত তারা অধিক পরিমাণে শক্তি পান
৪। সারাদিন সতেজ রাখে

মডারেট কার্ব

মডারেট কার্ব সচারচর শরীরের ওজন ধরে রাখতে সহায়তা করে। শরীরের যেই ওজন তা যদি কারোও জন্যে আদর্শ হয়ে থাকে এবং একটি সুস্থ সুন্দর ও দীর্ঘ জীবন কামনা করে থাকেন তবে তার জন্যেই এই ডায়েট। এই ডায়েট এ মুলত খাদ্যের পরিমাণ এমন ভাবে নির্ধারিত হয় যেখানে শর্করা মধ্যম পরিমাণে, প্রোটিন মধ্যম পরিমাণে থাকে। এটি কে সচরাচর বলা হয়ে থাকে ক্লিন ইটিং। এটি মুলত একটি সুস্থ, সুন্দর এবং আদর্শ জীবন গড়ে তোলার জন্যে সহায়ক ডায়েট হিসেবে কাজ করে থাকে। এই ডায়েটের মাধ্যমে একজন ব্যাক্তি তার দেহের আদর্শ ওজন ধরে রাখতে পারে।

মডারেট কার্বের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন সুস্থতা নিশ্চিত হয়। এটি দেহের বিভিন্ন দৈহিক চাহিদা পুরণ করে থাকে। দেহকে সতেজ করে, চেহারার উজ্জলতা বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘকাল কর্মক্ষম রাখে। মডারেট কার্ব ডায়েটকে বলা যায় সুস্থ এবং সুন্দর জীবনের শুরুর ধাপ।

ওমেড(ONE MEAL A DAY)

ওমেড বা One Meal A day এমন এক ডায়েট যেখানে দিনে কেবল মাত্র একবার খাদ্য গ্রহণ করা হয়। যেহেতু দিনে কেবল এবং কেবল মাত্র একবারের বেশি খাদ্য গ্রহণ করলে খুব বেশি পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করা যাবেনা তাই স্বাভাবিক ভাবেই ওজন কমতে থাকে।

তবে এটি অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া। যাদের গ্যাস্ট্রিক এর সমস্যা রয়েছে তাদের উচিৎ এই ডায়েট না করা। এটি শরীরে প্রায়শই হীতের বিপরীত করে থাকে। এই ডায়েটে শুধু মাত্র দিনে ১ টি বার খাদ্য গ্রহণ করা যায়। বাকি সময় কেবল মাত্র ব্ল্যাক কফি, গ্রিন টি সালাদ এর মতন খাবার খেয়ে থাকতে হয়। ওমেড এ অনেকেই জাংক ফুড কিংবা এর মতন অনেক খাবার খেয়ে থাকেন। যা কিনা একদমই অস্বাস্থ্যকর। এর ফলে শরীরে দুর্বল ভাবসহ নানা প্রকার জটিলতা দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ৭টি ভুল

কার্ব সাইক্লিং

কার্ব সাইক্লিং একটি অন্যতম প্রচলিত ডায়েট। ওজন কমাতে বা চর্বি কমাতে বেশ কার্যকর পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে শর্করা গ্রহণের পরিমাণ এমন ভাবে নিতে হয় যেন কখনো খাবার এ শর্করার এর পরিমাণ বেশি কখনো মাঝারী এবং কখনো খুবই কম।

যারা ভাত ছাড়া খাবার কল্পনাও করতে পারেন না কিংবা অল্প পরিমাণে ভাত খেয়ে অভ্যস্ত হতে পারেন না এই ডায়েটটি তাদের জন্যেই। এই ডায়েট লো কার্ব ডায়েটের মতনই কার্যকরী তবে এই ডায়েট অনেকের জন্যেই সহজ হয়ে যায়। যেহেতু সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনগুলিতে শর্করা এর পরিমাণ বেড়ে যায়। কার্ব সাইক্লিং এর মাধ্যমে ওজন কমানো বেশ সহজ হয়ে যায়। যারা খুব প্রাথমিক ভাবে ডায়েট নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত কিংবা আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওজন কমানোর কিন্তু ডায়েট মানেই চোখের সামনে না খেয়ে থাকা মাথায় আসায় ডায়েট করতে পারছেন না এই ডায়েট ঠিক তাদের জন্যেই।

উপরে উল্লিখিত ডায়েট ছাড়াও আরোও অনেক ডায়েটের পদ্ধতি রয়েছে। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন কোন পদ্ধতি সেরা তবে তার কোন নির্দিষ্ট উত্তর নেই। সত্যি কথা বলতে যে ডায়েট করে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যেই ডায়েট করে আপনি ফলাফল খুব দ্রুত পাচ্ছেন সেই ডায়েটই আপনার জন্যে যথেষ্ট। আর আপনার ওজন তখনই কমবে যখন আপনি ক্যালরিক ঘাটতিতে থাকবেন।

আর ডায়েট শুরুর পুর্বে প্রতিটি ডায়েট সম্পর্কে জেনে নিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নিন। মনে
রাখবেন সুন্দর লাইফস্টাইল, সুন্দর জীবন, সুন্দর আপনি।